৪ অক্টোবর, ২০২৬

ফলের দামের সরকারি অসত্য তথ্যে চোখ কপালে, দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ব্যয়বহুল বাংলাদেশ!

ফলের দামের সরকারি অসত্য তথ্যে চোখ কপালে, দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ব্যয়বহুল বাংলাদেশ!

ভোক্তার পকেট খালি করে ফলের বাজার যখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, তখন সরকারি প্রতিবেদনের কাল্পনিক ও বাস্তববিচ্ছিন্ন তথ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময়।

রাজধানীতে প্রতি কেজি কমলা ও মাল্টা ৫০০ টাকায় বিক্রি হলেও, সরকারি নথিতে সেই দাম দেখানো হচ্ছে প্রায় অর্ধেক!

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ফলের দাম আকাশচুম্বী হলেও শুল্কের জাঁতাকল, আমদানিকারকদের কারসাজি এবং কোল্ডস্টোরেজ ও সরবরাহ ব্যবস্থার চরম অব্যবস্থাপনায় বাজার এখন লাগামহীন।

শনিবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের পেশ করা এক প্রতিবেদনে এই বাস্তববিচ্ছিন্ন চিত্র উঠে আসে।
১. সরকারি কাল্পনিক তথ্য বনাম বাজারের নির্মম বাস্তবতা
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাজারে প্রতি কেজি মাল্টার দাম ২৪০–৩২০ টাকা এবং কমলার দাম ২৫০–৩৫০ টাকা।

অথচ বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো:

কারওয়ান বাজার ও জিগাতলা: খুচরা বিক্রেতারা প্রতি কেজি মাল্টা ৪০০–৪২০ টাকা এবং কমলা ৪৮০–৫০০ টাকায় বিক্রি করছেন।

সন্দেহ ও এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি: কোন তথ্যের ভিত্তিতে এই কাল্পনিক হিসাব তৈরি করা হয়েছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হলে ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির-উদ-দৌলা কোনো স্পষ্ট উত্তর না দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান। প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী কর্মকর্তাকে ফোন ও মেসেজ করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

বাণিজ্যমন্ত্রীর অসন্তোষ: বাজারে মাল্টার দাম কেজিপ্রতি ৫২০ টাকায় পৌঁছানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করে বাণিজ্যমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের কাছে এর স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছেন।

২. আকাশচুম্বী দামের তিন প্রধান কারণ

দেশে তাজা ফলের বার্ষিক চাহিদা ৫ থেকে ৬ লাখ টন (যার ৯৫ থেকে ৯৯ শতাংশই আমদানি করা হয়)। আমদানিনির্ভর এই বাজারের বেহাল দশার জন্য তিনটি বড় কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:

আকাশছোঁয়া শুল্কের জাঁতাকল (৯৬% – ১২১%):

পুষ্টিকর তাজা ফলকে ‘বিলাসদ্রব্য’ হিসেবে গণ্য করে শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে। এতে ২৫% আমদানি শুল্ক, ২০–৩০% সম্পূরক শুল্ক, ১৫% ভ্যাট, ৫% অগ্রিম আয়কর এবং ২০% নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কের চাপে আমদানিকৃত পণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে।

কাস্টমসের কৃত্রিম দর নির্ধারণ:

 আন্তর্জাতিক বাজারের প্রকৃত ইনভয়েস বা বুকিং দরের চেয়ে বেশি দর ধরে কাস্টমসে শুল্কায়ন করা হচ্ছে, ফলে করের বোঝা আরও বাড়ছে।

সরবরাহ শৃঙ্খলে বাধা ও কোল্ডস্টোরেজের চরম সংকট:

সীমিত সংখ্যক আমদানিকারক এবং পর্যাপ্ত কোল্ডস্টোরেজ (হিমাগার) না থাকায় সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। সঠিক সংরক্ষণের অভাবে আমদানিকারক ও কোল্ডস্টোরেজের অব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

৩. দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশেই ফলের দাম সবচেয়ে বেশি

ট্যারিফ কমিশনের আঞ্চলিক তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে ফলের জন্য সবচেয়ে বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে:

ফল (প্রতি কেজি)

বাংলাদেশ (টাকা)

ভারত (টাকা)

পাকিস্তান (টাকা)

নেপাল (টাকা)

শ্রীলঙ্কা (টাকা)

আপেল

২৮০ – ৩৮০

১৫০ – ২২০

১১০ – ১৭০

১৬০ – ২৪০

৩৫০ – ৪৫০

আঙুর

৩০০ – ৪৫০

১৩০ – ২০০

১০০ – ১৬০

১৫০ – ২৩০

৩৮০ – ৫০০

সাধারণ খেজুর

২৫০ – ৪৫০

১৬০ – ২৬০

১২০ – ২০০

১৮০ – ২৮০

৩২০ – ৪৫০

আরও খবর পড়ুন