৯ অক্টোবর, ২০২৬

ডিম খামারির লোকসান আর মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে পিষ্ট সাধারণ ভোক্তা

ডিম খামারির লোকসান আর মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে পিষ্ট সাধারণ ভোক্তা

খুচরা বাজারে একটি ডিমের দাম এখন ১৩ টাকারও বেশি, যা বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড। প্রোটিনের সহজলভ্য উৎস হিসেবে পরিচিত এই সাধারণ ডিম কিনতে গিয়ে প্রতিদিন সাধারণ মানুষের মধ্যে যে দীর্ঘশ্বাস ও আক্ষেপ তৈরি হচ্ছে, তা কেবল এক হালি ডিমের হিসাব নয়—এটি পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলের এক গভীর বৈপরীত্যের গল্প।

একদিকে উচ্চ মূল্যে ডিম কিনে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ ভোক্তার, অন্যদিকে যে খামারি রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে ডিম উৎপাদন করছেন, তিনি পাচ্ছেন না তাঁর কষ্টের ন্যায্য মূল্য।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে গত এক দশকে ডিমের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৬৮ শতাংশের বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যেখানে বছরে ১,৪৯৩ কোটি পিস ডিম উৎপাদিত হতো, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,৫০৯ কোটি পিসে। এর অর্থ হলো, এখন প্রতিদিন দেশে ৬ কোটি পিসের বেশি ডিম উৎপাদিত হচ্ছে, যার ৮০ শতাংশই জোগান দিচ্ছেন প্রান্তিক খামারিরা।

অথচ এই বিশাল উৎপাদনের সুফল পাচ্ছেন না ক্রেতা কিংবা খামারি—কেউই নয়।

বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একটি ডিম উৎপাদনে খামারির বর্তমানে খরচ হচ্ছে অন্তত ১০ টাকা ২৫ পয়সা। সারা দেশের খামার থেকে আড়তদার বা পাইকাররা ডিম কিনছেন প্রায় ১১ টাকা ১১ পয়সায়। অর্থাৎ একটি ডিম উৎপাদন করে খামারির পকেটে লাভ ঢুকছে এক টাকারও কম। কিন্তু সেই একই ডিম যখন শহরের খুচরা দোকানে গিয়ে পৌঁছায়, তখন ভোক্তাকে তা কিনতে হচ্ছে ১৩ টাকা বা তারও বেশি দামে।

খামার থেকে ভোক্তার খাবার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছানোর এই অল্প দূরত্বের ব্যবধানে প্রতিটি ডিমে দাম বেড়ে যাচ্ছে প্রায় দুই টাকা বা তারও বেশি। প্রতিদিন দেশে উৎপাদিত ৬ কোটি ডিমের হিসাবে কেবল এই মধ্যবর্তী হাতবদলগুলোর পেছনেই চলে যাচ্ছে প্রায় ১২ কোটি টাকা।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ডিমের বাজারমূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়াই এই বিশৃঙ্খলার মূল উৎস। পোলট্রি খামারিরা কষ্ট করে ডিম উৎপাদন করলেও তারা নিজেদের পণ্যের দাম নির্ধারণ করতে পারেন না। নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী সমিতি আড়ত কেন্দ্রিক মোবাইল মেসেজের মাধ্যমে প্রতিদিনের দাম ঠিক করে দেয়। সরবরাহ কম থাকুক বা বেশি, প্রান্তিক খামারিদের সেই নির্ধারিত দামেই ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হতে হয়।

এর পাশাপাশি যোগ হয়েছে পোলট্রি খাদ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি। বগুড়া ও টাঙ্গাইলের খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভুট্টা, ব্রান ও প্রস্তুতকৃত ফিডের দাম গত এক মাসেই বস্তাপ্রতি ১০০ থেকে দেড়শ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ডিম উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি খরচ হয় ফিডের পেছনে, যা দিন দিন খামারিদের টিকিয়ে রাখা কঠিন করে তুলছে।

সবচেয়ে বড় আক্ষেপের জায়গা তৈরি হয় সরকারের নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। বাজারে যখন ডিমের দাম বাড়ে, তখন সরকারের তরফ থেকে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ বা তদারকি শুরু হয়। কিন্তু যখন অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে কিংবা কারসাজিতে ডিমের দাম ৮-৯ টাকায় নেমে যায় এবং খামারিরা একটানা লোকসান গোনেন, তখন তাদের রক্ষায় কোনো সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ করা হয় না।

গত জুন থেকে সেপ্টেম্বর মেয়াদে একটানা লোকসান সহ্য করতে না পেরে দেশের বিভিন্ন জেলায় খামারিরা সড়ক অবরোধ, ডিম ভেঙে প্রতিবাদ এমনকি স্মারকলিপি পর্যন্ত দিয়েছেন। লোকসানের ধাক্কায় ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে বহু প্রান্তিক খামার।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, একজন মানুষের বছরে ১০৪টি ডিম খাওয়া প্রয়োজন এবং বাংলাদেশে বর্তমানে মাথাপিছু জোগান রয়েছে ১৪০টিরও বেশি। কিন্তু সরবরাহের কোনো ঘাটতি না থাকা সত্ত্বেও যদি বাজার পরিচালনায় স্বচ্ছতা না থাকে, তবে এ শিল্পে ধস নামা ঠেকানো কঠিন।

মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে খামারিদের সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার কার্যকর ব্যবস্থা এবং ফিডের দাম নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে, এই সাধারণ ডিমই একসময় আমজনতার থালা থেকে চিরতরে দূরে সরে যাবে।

আরও খবর পড়ুন