উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে যে আলু একসময় সমৃদ্ধি আর ঘুরে দাঁড়ানোর আশা জোগাত, সেই আলুই এখন বগুড়াসহ পুরো উত্তরাঞ্চলের কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য চরম বোঝার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাঠে বাম্পার ফলন আর হিমাগারে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও ন্যায্যদাম না পাওয়ায় প্রতিটি ধাপে বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখোমুখি হচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি অর্থনীতির জটিল সমীকরণ ও বাজার পরিস্থিতির চরম অসঙ্গতিই কৃষককে আজ এমন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
একটি ফসল খেত থেকে হিমাগার পর্যন্ত পৌঁছাতে কৃষককে কয়েকটি ধাপে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। জমি তৈরি, সার ও বীজ ক্রয়, পরিচর্যা, ফসল তোলা, পরিবহন এবং হিমাগারের সংরক্ষণ মাশুল—সব মিলিয়ে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ টাকা।
কিন্তু বিপত্তি বেধেছে বিক্রির সময়ে। বর্তমানে হিমাগার গেটে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১৪ থেকে ১৫ টাকা দরে। এর ফলে প্রতি কেজি আলুতে স্পষ্টতই ৯ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।
লাভের মুখ দেখা তো দূরের কথা, উৎপাদন ও সংরক্ষণের মূল খরচই তুলতে পারছেন না তারা।
বগুড়া কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি মৌসুমে জেলার ৫১টি হিমাগারে প্রায় ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৮৪২ মেট্রিক টন খাবার ও বীজ আলু রাখা হয়েছিল।
তবে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে হিমাগারগুলো থেকে মাত্র ২ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০ টনের মতো খাবার আলু খালাস হয়েছে।
হিমাগারে এখনও বিপুল পরিমাণ আলু অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে থাকা ইঙ্গিত দেয় যে, বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। পর্যাপ্ত আলু হিমাগারে জমে থাকা এবং বাজারজাতকরণের গতি ধীর হওয়ায় দামের ওপর প্রচণ্ড নিম্নমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
এই দরপতনের প্রভাব পড়েছে সাধারণ কৃষকদের জীবনযাত্রায়।
শিবগঞ্জ উপজেলার ধোন্দাকোলা গ্রামের কৃষক আজিজুল ইসলামের মতে, গত বছর কষ্ট করে ফলানো আলু হিমাগারে রেখেছিলেন এই আশায় যে, সেগুলো বিক্রি করে প্রাপ্ত টাকায় চলতি মৌসুমের সার ও বীজ কিনবেন।
কিন্তু বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করলে মূলধনই হাওয়া হয়ে যাচ্ছে, যা আগামী মৌসুমে নতুন করে আলু চাষের বিনিয়োগকে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।
কৃষকের পাশাপাশি যেসব ব্যবসায়ী লাভের আশায় আলু কিনে হিমাগারে রেখেছিলেন, তারাও এখন দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে।